This Article is From Mar 23, 2020

‘থাকবো আজ বদ্ধ ঘরে; দেখবো না কো জগৎটাকে’

এই করোনা সংক্রমণের জেরে সবচেয়ে বেশী বিপন্ন এই গ্রহের বুদ্ধিমান প্রজাতি Homo Sapiens. অর্থাৎ মানুষ

কলকাতা:

এ যেন এক অন্য গ্রহের রবিবার। বাড়ির গা ঘেঁষে বসা বাজারের শোরগোল নেই। বাসের হর্ন; অটোর প্যা-পোঁ নেই। নেই রাস্তার ওই পারের বিল্ডার্সের দোকানে নির্মাণ শ্রমিকদের জমায়েত। লরি থেকে ইট-বালি নামানোর ধপাধপ শব্দও নেই। এ যেন অন্য গ্রহের এক রবিবার। দরজা খুললেই ধু-ধু করছে রাস্তা।  ঠিক যেন Residential Evil-final chapter-এর দৃশ্য। ছড়িয়ে গিয়েছে T-Virus। প্রাণের স্পন্দন কোথাও নেই। আর সেই জনমানবহীন রাস্তায় একা হেঁটে বেড়াচ্ছে এলিসা। ঠিক এমন একটা সকাল; রবিবার উপহার দিল 'জনতা কি কার্ফু।' নেপথ্যে করোনা ভাইরাস। গত সপ্তাহে জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী আবেদন করেছিলেন; আসুন আমরা সংক্রমণের চেনটা ভাঙি। ২২ মার্চ; সকাল ৭টা- রাত ৯টা পালন করি জনতা কি কার্ফু।   আজ সেই ২২ মার্চ। প্রধানমন্ত্রীর ডাকে সাড়া দিল আসমুদ্র হিমাচল। আর এই করোনা সংক্রমণের জেরে সবচেয়ে বেশী বিপন্ন এই গ্রহের বুদ্ধিমান প্রজাতি Homo Sapiens. অর্থাৎ মানুষ। আর Covid-১৯-কে বিপন্ন করতে রবিবার 'কার্ফু' নামক অস্ত্র হাতে তুলে নিল সেই মানুষই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন; এই কার্ফুই একমাত্র প্রতিষেধক করোনার। মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করো; বাহক না পেয়ে বাপ-বাপ করে পালাবে করোনা। সেই পরামর্শ মেনেই 'থাকবো আজ বদ্ধ ঘরে; দেখবো না জগৎটা-কে' মন্ত্র জপল কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা।

এবার সেই 'জনতা কি কার্ফু' আদতে কতটা স্বতঃস্ফূর্ত? দেখতে বেরিয়েছিলাম। হাঁটা শুরু করলাম। বাড়ি থেকে বেরিয়ে ডানদিক-বামদিক তাকাতেই দেখলাম কনক্রিট; পিচ আর সবুজ। এর বাইরে আর কোনও প্রাণের স্পন্দন নেই। একদম ঝাঁপ ফেলা মোড়ের অতিপরিচিত চায়ের দোকান। সেই দোকান পেরিয়ে বিরাটি স্টেশনের দিকে  মিটার চারশো হাঁটার পর প্রথম মানুষ দেখলাম। সে আবার বেরিয়েছে কুকুরকে খাওয়াতে। একটু এগিয়ে পুলিশের গাড়ি। তবে সে খুব একটা বিরক্ত করছে না। এমন জনমানবশূন্য পথে প্রায় আধ কিমি হাঁটার পর একটা বিকল্প খুঁজে পেলাম। দেখলাম এক দম্পতি সেজেগুজে মুখে পান চিবোতে-চিবোতে আমার দিকে আসছে।

কৌতূহলী হয়ে তাঁদের জিজ্ঞাসা করলাম; একটু ঘুরিয়ে; ট্রেন চলছে নাকি? তাঁরা বললো স্টেশন থেকে আসছি না দাদা, এক আত্মীয়ের ছেলের মুখের ভাত ছিল সেটা খেয়ে ফিরছি। আমি খানিকটা হতাশ মুখে ওহ আচ্ছা! বলে একটু এগিয়েছি। কানে মন্তব্য এলো; "এদের জন্যই লকডাউন দরকার।" পিছন ফিরে দেখলাম; দু'জন সিভিক পুলিশ আর স্থানীয় ওষুধের দোকানের এককর্মী। প্রত্যেকেই মুখোশ পরা। ওদের সমালোচনার কেন্দ্রে সেই দম্পতি। যাক! তাহলে মানুষ সচেতন; এই ভাবতে ভাবতে স্টেশনে পৌঁছতে দেখলাম এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে একটা ডাউন ট্রেন। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল না, কিন্তু পরে ইচ্ছা করেই প্ল্যাটফর্মে উঠলাম।

উপলক্ষ্য; কত লোক ট্রেনে; দেখা। ট্রেন ছাড়ার আগ পর্যন্ত যতটা চোখে ঠাওর হল; সেখান থেকে দাবি করতেই পারি; গোটা ট্রেনে বড়জোর একশো জন। আর অধিকাংশ দিন আনি-দিন খাই তালিকাভুক্ত। অর্থাৎ না বেরোলেই নয়! যাক! পেটের দায়ে মানুষ চুরি-ডাকাতি করছে। আর এরা নয় একটু খেটে খাওয়ার জোগার করছে। এমন সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে যখন বাড়িমুখো; হঠাৎ ছোট মাথায় একটা প্রশ্ন এলো।

কলকাতার প্রথম করোনা আক্রান্ত তরুণ লন্ডন ফেরত। গঙ্গাপারের  শহর নয় রবিবার চিড়িয়াখানা; এসপ্লানেড; পার্কস্ট্রিট; ইকো পার্ক ভুলে ঘরে; টেমসের পারের শহরের কী খবর? যেমন ভাবনা; তেমন প্রতিক্রিয়া। WhatsApp- ভিডিও কলে ধরলাম এক বান্ধবীকে। পল্লবী পাল নামে সেই বান্ধবী; লন্ডনের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া। বাড়ি হুগলি জেলায়। তাঁর Research Subject: আন্তর্জাতিক পড়ুয়াদের ইউ-কে'র শিক্ষাব্যবস্থায় কতটা সুযোগসুবিধা।

যাইহোক; ধরা হলো তাঁকে। করুণ মুখে বলে উঠলো; কী চাই? আমি বললাম; তোর শহরের খবর। বলছে; খবর আর কী। গত সপ্তাহে থেকে অঘোষিত বনধ ছিল। খোলা সবকিছু কিন্তু নেই গ্রাহক। অর্থাৎ টেমস পারেও 'জনতা কি কার্ফু।' সেই বান্ধবী খানিকটা বিরক্তি নিয়ে আরও বললো;  এমন খুলে রাখার কী মানে বুঝলাম না! এদিকে ধীরে ধীরে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জোগান কমছে। 'পাউন্ডল্যান্ড' বলে একটা বিপণী আছে, সেখান থেকে আবার পাঁচটার বেশী জিনিস কেনাতে নিষেধাজ্ঞা। কারণ লাগু 'টেসকো ল'। ফলে আগামীদিনে কী করে সামলাব বুঝতেই পারছি না। এদিকে ঘরে বসেই এখন পড়া থেকে কাজ থেকে টিউশন। তাই ভাঁড়ারও ক্রমশ তলানিতে। নেই টয়লেট পেপার, টিস্যু, পেস্ট, ড্রাই ফ্রুট, পর্যাপ্ত পানীয় জলের জোগান। সমানেই ইস্টার; আর এত নেইয়ের মধ্যেও মানুষ যেন কেমন উদাসীন!

পল্লবীর আরও দাবি, আর এমন সময় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে; যে বাড়ি ফেরারও ফুরসত নেই। শুধু বলেছে বাড়িতেই থাকো। দেশে ফিরতে পারি, এমন একটা চিঠিও ধরিয়েছে। কিন্তু এত দেরিতে বিষয়টায় হস্তক্ষেপ করেছে, যে বাড়ি ফেরার উপায় নেই। টান আন্তর্জাতিক উড়ানে। সঙ্গে এতটা পথ জেটল্যাগ নিয়ে শহরে ফেরা মানে আবার সেই 'সন্দেহভাজন' হওয়া। এভাবে নিজেকে এবং কলকাতাকে ঝুঁকির মধ্যে না ফেলাই ভালো। এদিকে,  এনএইচএস; অর্থাৎ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো মিনিমাম জ্বর; কাশি নিয়ে গেলেও ভর্তি নিচ্ছে না। বলছে বাড়িতে থাকো; গরম জল খাও। কথাই বলছে না সেভাবে কেউ। রিসেপশনেই আটকে দিচ্ছে। শুধু টোল ফ্রি নম্বরে ফোন করলে বলছে: এই করুন, সেই করুন। বেশ আর কোনও দায় নেই।  

আমি আবার পার্টটাইমে এক জায়গায় কাজ করি; সেখানেও তথৈবচ অবস্থা। খোলা রাখতে হয়, তাই স্টোর খোলা। পাব, ক্লাব, রিটেল আউটলেটের মতো গণজমায়েত স্থল অবশ্য বন্ধ। কথায় কথায় এমনটা বললো পল্লবী। এভাবেই আশা-আশঙ্কার দোলাচলে বিলেতে দিন কাটছে। এমন উদ্বেগও বেরিয়ে এসেছে তাঁর মুখ থেকে। অর্থাৎ কথা শুনে ও নিজের চোখে দেখে যা বুঝলাম; কলকাতা হোক বা লন্ডন; একটা আতঙ্কে 'গৃহবন্দী' মানুষ। অদৃশ্য এক ব্রিজ। আর সেই 'মানবসেতু' রবিবার জুড়ে দিল টেমস আর গঙ্গাকে। নেপথ্যে ‘জনতা কি কার্ফু।‘

.