This Article is From Feb 19, 2019

আমাদের সেই সব গ্যাসবেলুন, কাঠি আইসক্রিম আর ক্যাম্বিস বলের দিনগুলো

ছোটবেলাটা মাঝে মাঝে ড্রপ খেতে খেতে চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়। সরস্বতী পুজো, দালের মেহেন্দি, হারিয়ে যাওয়া বন্ধুগুলো ও ক্যাম্বিস বল। বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য'র নতুন ব্লগ। আজ ষষ্ঠ পর্ব।

ছোটবেলাটা মাঝে মাঝে ড্রপ খেতে খেতে চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়। সাইকেল চালানো শিখছে মিমো। আমি তো চিরকালীন ক্যাবলা। ওসব পারি না। ওর বাবা ইন্দোনেশিয়া থেকে এনে দিয়েছে সাইকেল। একবার প্যাডেলে চাপ দিলেই পেছনের চাকার ওখানটা দিয়ে কী ঝিলিক মারে রে ভাই! আমাকে বলল, চালাবি? আমি তো মাথা নেড়ে দিয়েছি। ব্যাস! বসেই ধাঁ! টোটাল উল্টে গেলাম! মিমো আর ওদের বাড়িতে কাজ করত, আরতি, কী হাসি তাই দেখে! কেমন বোকা দেখ! মাথা ফাটিয়ে দিতে ইচ্ছে হল অক্ষয় কুমারের স্টাইলে। কিন্তু করা গেল না। মিমোর কাছ থেকে আমার অরবিন্দ ডি সিলভার বিগ ফান-এর কার্ডটা ধার নেওয়ার কথা। ঝগড়া হলে তো আর দেবে না! তখন আবার শ্রীলঙ্কা সবে ওয়ার্ল্ড কাপ জিতেছে। আমি অরবিন্দ ডি সিলভার ফ্যান। মিমো জয়সূর্যর। আমার জয়সূর্যকে ভাল লাগে না, সোনাদা বলেছে ও পুরো আনাড়ি, মাইরি। মিমোকে তা বলতেই ও নালিশ করে দিল ওর মাকে। আমি নাকি মাইরি বলেছি! তারপর কী বকা খেলাম কাকিমার কাছে, বাপস! তবে আমি পেয়ারা গাছে হেবি চড়তে পারতাম। ওদের বাড়ির পাশের বড় পেয়ারা গাছটায় আমি আর মিমো ঘোড়ার মতো চেপে বসতাম। সামনে আমি, ও পেছনে। অনাথদা বলল, পুরো শোলে তো রে! জয়-বীরু!

অন্য ব্লগ পড়ুন:

এক গাঙ্গেয় সন্ধ্যার বিষণ্ণ রূপকথা

মিমোদের বাড়িতে আমাদের পাড়ার প্রথম কম্পিউটার। সাদাপানা দেখতে। পেটমোটা। আমার বাড়িতে আবার সবাই বলত, আমার নাকি কম্পিউটার ব্রেন। শুনেই আয়নার সামনে চলে গেলাম। খুব রাগ হয়ে গেল। আমার মাথাটা দেখতে মোটেই অত বেঢপ না। বিচ্ছিরি না। কী সুন্দর দেখতে আমায়! যা খুশি বললেই হল! ব্রেনটা যে আসলে মাথার ভেতরে পুরে দেওয়া থাকে, মাথাটা যে শুধু তার একটা খোলস মাত্র, তখন কি আর তা জানি ছাই! পাঁচিল টপকাতে গিয়ে তার গায়ে লেগে থাকা শ্যাওলায় পা হড়কে গিয়ে পাশের পুকুরে পড়ে গেলাম। সাঁতার জানি না। পিন্টুদা ওই সময় সামনে না থাকলে কে বাঁচাত আমায়!

ব্লগঃ জঙ্গলমহলের বাপ ও রতনমোহন শর্মার বন্দিশ

এক সরস্বতী পুজোর দিন, দালের মেহেন্দির 'হো যায়েগি বল্লে বল্লে' চলছে গমগম করে, কচি প্যান্ডেলের পিছনে নিয়ে এসে বলল, বুনিদিদি প্রেম করে বিকাশ বলে একটা ছেলের সঙ্গে। সেই ছেলে গত বছর পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে ক্লাস নাইন অবধি পড়ে। বুনিদিদি আমাদের সঙ্গে খেলত। খুব জোরে বল করত। যা ইয়র্কার দিত না! ওয়াকার ইউনিসের বাবা! কচি আমাকে কথাটা বলার সময় দিব্যি কাটিয়ে নিল। বলল, এই কথা কাউকে বললে নাকি আমার মা মরে যাবে। আমি চারদিনের দিন নাগাদ লুকোচুরি খেলতে খেলতে কী যে হল, টুক করে কথাটা বলে দিলাম পঙ্কাকে। সেটা কচির কানে গেল। ও আমাকে বলল, তোর মা আজ রাতে মরে যাবে। আমি শুতাম আমার ঠাম্মার সঙ্গে। মা বাবা ভাই আরেক ঘরে। সেদিন রাতে শোওয়ার পর কিছুতেই ঘুম আসে না আর। সকালে তো ইস্কুল। ভোরবেলা মা টেনে তুলে দেয় রোজ। আমি জানি মা আর কাল সকালে থাকবে না। অথচ কাউকে এই কথাটা বলতেও পারছি না। এত কান্না পাচ্ছিল ঘুমনোর আগে একশো আট বার শিবের নাম করতেও ভুলে গেলাম। অনেক রাতে ঠাম্মার পাশ থেকে উঠে গিয়ে শুয়ে রইলাম মায়ের ঘরের দরজার সামনে। সকালে উঠে মাকে আবার দেখতে পেয়ে জড়িয়ে ধরে সে কী কান্না।

ব্লগঃ টেলিফোন বুথের দিনকাল ও শ্যামল কাকা

দিদি কার্ড জমাত নায়ক-নায়িকাদের। শারুপ খান, অমিতা বচ্চন, সলমন খান, রবিনা ট্যান্ডন, কাজল-দের। আমি ছাড়া ওই জমানোর খবর আর কেউ জানত না। বাড়িতে বড় কাঠের চেয়ার ছিল একটা। দাদুর চেয়ার বলা হতো ওটাকে। তা, এক শুক্রবার টিভিতে দিওয়ার দিল। দাদুর চেয়ারে বসে কে দেখবে তাই নিয়ে আমার সঙ্গে ওর ঝামেলা শুরু হল। সেই সময় রাগ করে জেঠিকে আমি বলে দিলাম ওই কার্ড জমানোর ব্যাপারটা। কী মার খেল দিদি। আমার দিকে ছলছল করে তাকিয়ে রইল। রাতে খেতে বসে মাছের মুড়ো খেল না। আমাকে দিয়ে দিল। কোনদিন দেয় না। সে দিন দিয়ে দিল।

বুড়োদাদের বাড়ির পেছনেই আমাদের খেলার মাঠ। কী বিশাল! আমি একবার ওপাশ ওপাশ করলেই হেদিয়ে যেতাম। বাবলাদা বলেছিল, আজহারউদ্দিন নাকি এরকম মাঠই সত্তর বার এ-পাশ ও-পাশ করে। রেগুলার। অ্যাত ফিট! ফুটবল বিশ্বকাপের সময় আমাদের অতদিনের ফুটবলটা কেমন ফুস করে ফেটে গেল। এমন অবস্থা, নতুন কেনা ছাড়া উপায় নেই। অথচ, টাকার বন্দোবস্ত করা মুশকিল। আবার বিশ্বকাপের সিজনে তো ফুটবল ছাড়া অন্য কিছুও খেলা যাবে না। কী হবে, উপায় দিল বুম্বাদা। আমাদের ক্রিকেট খেলার ক্যাম্বিস বলটা নিয়ে আসা হল। ওটা দিয়েই আপাতত ফুটবল চলুক। সেটা দিয়ে খেলতে খেলতেই ছোটন একটা থ্রো করল, আমি তার আগেরদিন জার্মানির ক্লিন্সম্যানকে দেখেছি হেড করে গোল দিতে। আমিও হেড দিলাম। উফফফফফ! কী লাগল! চোখের সামনে পুরো যশ চোপড়ার ‘বই'-এর সর্ষের খেত। আমার ওই ক্লাস টু-এর কম্পিউটার মাথা নিমেষে ফুলে ঢোল। আমার খেলা বন্ধ হয়ে গেল অন্তত তিন হপ্তার জন্য। ব্যথাটা রয়ে গেল আরও বেশ কয়েকদিন… এই এখন, সেই ব্যথাটাই, ইউটিউবে আমির খানের ‘রঙ্গিলা'-র গান শুনতে শুনতে একুশ-বাইশ বছর আগের দিনগুলোর জন্য টের পাচ্ছি যেন। হঠাৎ। তবে মাথা নয়, মাথা নয়, অন্য কোনওখানে...