This Article is From Feb 19, 2019

জঙ্গলমহলের বাপ ও রতনমোহন শর্মার বন্দিশ

শুরু হল সাংবাদিক এবং লেখক বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্য'র নতুন ব্লগ। আজ দ্বিতীয় পর্ব। এক মাওবাদীর বাবা ও তাঁর সন্তানের মর্মস্পর্শী কাহিনী রইল আজ।

এক ঠাণ্ডা পৃথিবীর ততোধিক ঠাণ্ডা জানলার বাইরে তাকালাম। জানলার বাইরে অন্ধকার লুটিয়ে পড়ে আছে। সেই অন্ধকারের মাথায় টিকার মতো লেগে রয়েছে গোল সাদা চাঁদ। চাঁদটি সরে যায়। চাঁদটি সরে সরে যায়। মনে হয়, এই ঘুটের মতো অন্ধকার লেপে থাকা আকাশটি দিয়ে একলা চাঁদটি একসময় ঠিকই চলে যাবে কোনও হ্রদে বা কোনও সমুদ্রের জলে। বছর দুয়েক আগে এমন এক অন্ধকারের ভিতর দিয়েই হাঁটছিলাম জঙ্গলমহলের রাস্তার মধ্য দিয়ে।  জায়গাটির নাম খড়িকামাথানি। খড়গপুর থেকে বাস পেয়ে গেলে দু'ঘন্টা লাগে। জায়গাটার পাশ দিয়ে কেমন এক আশার মতো অবিরাম বয়ে চলেছে সুবর্ণরেখা নদী। তার ওপর নতুন ব্রিজ হয়েছে। একটু এগোলেই ওড়িশা বর্ডার। চাল আর মাছ খুব সস্তা। দুধের প্যাকেট বারো টাকা। ব্রিজ হওয়ার পর দুধের দাম বেড়েছে কিছুটা। তার আগে ছ'টাকা ছিল। গোটা অঞ্চলে একটিমাত্র লজ। তাতে চারটি ঘর রয়েছে। লজের মালিকের চুল সবসময় পেতে আঁচড়ানো। কপালের চামড়াগুলো কোন এক আশঙ্কায় কুঁচকে গিয়েছে চিরকালের মতো। সকাল ছ'টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত তিনি কোন এক টানে একটি মাত্র বাংলা কাগজই মন দিয়ে পড়েন। কোনও খবরের কোনও বিশেষ জায়গা পড়ে উত্তেজনা কিঞ্চিৎ বেড়ে গেলে 'শালাআআআহ' বলে জোরে বুকের একদম ভিতর থেকে অনেকটা বাড়তি হাওয়া সটান বের করে দেন। 

আরও পড়ুনঃ BLOG: মাঝেরহাট ব্রিজ, তুমি আমাদের বড় আপন ছিলে

একটি বিশেষ কাজে আমাদের ওই রাতে লজ থেকে খানিকটা দূরে যেতে হয়েছিল। ফিরতে রাত হবে বুঝতে পেরে আমি ও বন্ধু সাগ্নিক অন্য জায়গায় খাওয়াদাওয়া সেরে হাঁটতে হাঁটতে ফিরছিলাম। তখন দুর্গাপুজো শেষ। পেরিয়ে গিয়েছে কোজাগরী পূর্ণিমাও। চারদিক অন্ধকার। অন্ধকারের ভিতর দিয়ে আলাদা করে অন্ধকার দেখা যায় না। অন্ধকারটির প্রস্তুত হতে গেলেও কিছু আলোর প্রয়োজন। আলোর ভিতরের আলো ক্রমশ নিষ্প্রভ ও নিষ্প্রাণ হতে হতে যে অজ্ঞাত স্থানটির জন্ম দেয়, তা-ই হল অন্ধকার। সমস্ত আলো তো আগ্রাসী অন্ধকারেই সঙ্গত। তা, সেরকমই এক অন্ধকারের ভিতর দিয়ে হেঁটে আসছিলাম আমরা। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে হেঁটে আসছিলাম আমরা। এমন সময়ই খুব কাছ থেকে, বড়জোর দশ মিটার, একটি শব্দ কানে এল। শব্দটি আমাদের দুজনের পরিচিত। প্রিয়ও বটে। তবুও একটু অবাক হলাম। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গাইছে কেউ। আরেকটু স্পষ্ট হতে বুঝলাম, রতনমোহন শর্মা। বন্দিশ বাজছে। এর আগে এতক্ষণ হেঁটে আসতে আসতে  একমাত্র ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া আর কোনও শব্দ কানে আসেনি। চারপাশের গাছপালার এই আদিম-অফুরন্ত আয়োজনের মাঝে পড়ে ওই বন্দিশ একটুও থতোমতো না খেয়ে কোথায় যেন মিশে মিশে যাচ্ছিল। মিশে যাচ্ছিল মুহূর্তের পর মুহূর্ত ধরে। যা শূন্য ছিল এতদিন, তাও যেন ওই সুর পেয়ে ভরভরন্ত হয়ে উঠছে। 

ওই সুর ধরেই এগিয়ে গেলাম খানিকটা। দেখলাম রাস্তার ধারে একটি মাঝারিমাপের জলচৌকিতে বসে জঙ্গলের দিকে মুখ করে রয়েছেন হাঁটু পর্যন্ত সাদা ধুতি এবং পাঞ্জাবি  পরে থাকা এক বৃদ্ধ। গলায় মাফলার। রাস্তার ধারে অসুস্থ ও রুগ্ন হয়ে যাওয়া অল্প আলোতে তাঁকে এই বিশ্বের আদিমতম মানুষ বলে।মনে হচ্ছিল। আলতামিরার বাইসন আঁকাতেও যেন একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে তাঁর... 

ওই অঞ্চলে ধুতি এখনও নিষিদ্ধ হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। মুরগির কিলোই নব্বই টাকা। দেশি একটু বেশি। তিনি আমাদের প্রথমে দেখতে পাননি। পরে একবার দেখতে পেলেও তেমন পাত্তা না দিয়ে আবার জঙ্গলের দিকে মুখ করেই তাকিয়ে রইলেন। বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর তাঁর মোবাইলে বাজতে থাকা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতটি থামলে তাঁকে  জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি এভাবে এত অন্ধকারে বসে গান শুনছেন কেন?

কোনও উত্তর দিলেন না।

আমরা চুপ।

তিনিও চুপ।

ফের জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার নাম কী?

কী মনে হল কে

জানে! এবার উত্তর দিলেন।  

বললেন- ফুলেশ্বর পয়রা।

কথার পিঠে কথা  বসালাম, ফুলেশ্বর তো এদিক থেকে গেলে রূপনারায়ণের কিছু পরেই। রূপনারায়ণ দেখেছেন? পরিষ্কার বললেন, রূপই দেখিনি বাবু! নারায়ণ কী!

অথচ, ওই খাঁচা হয়ে যাওয়া গাল নিয়ে বসে থাকা মানুষটার পিছনের রাস্তায় ফরফর করে গজিয়ে ওঠা শাল-ইউক্যালিপটাসের জঙ্গলের মধ্যে থেকে ২০১৬'র সবে শীত আসতে থাকা ওই রাতটির মধ্য দিয়েই আমার কিঞ্চিৎ লেখাপড়া-জানা চোখটি দেখতে পেল, আইআরএইট ধান তুলে ফেলার মাঠ। তারপর আকাশ। সেখানে মাতালের ঠোঁট হয়ে ঝুলে পড়েছে মেঘ। মেঘের ভিতর থেকে কার্তিক মাসের অমাবস্যার অন্ধকার। ওখান থেকে যে বৃষ্টির ব্যাপারটা তৈরি হবে, তাকে সম্ভবত ক্লাস এইটের ভূগোলের বইতে 'পরিচলন বৃষ্টিপাত' বলেই জেনেছি।  ফুলেশ্বর পয়রাকে খানিকটা ইয়ার্কি করে বললাম, এত সুন্দর জায়গায় থাকার পরও এত দুঃখ করছেন, আপনি মরে যান না কেন! তিনি বললেন, মানুষ নিজের ইচ্ছেয় তো মরতে পারবে না বাবু। তবে নিজেকে মেরে ফেলা যায় ইচ্ছা করলে।

আরও পড়ুনঃ কালীপুজো 2018: কেন জ্বালানো হয় চোদ্দ প্রদীপ? জেনে নিন কালীপুজোর নির্ঘণ্ট ও গুরুত্ব

আমার সেই ইচ্ছা করেনি। এই জন্যেই বসে থাকি...

আপনি এখানে বসে আছেন কেন? আমার বন্ধু সাগ্নিক প্রশ্ন করল। 

এবার জলচৌকি থেকে শরীরটা খানিকটা বেঁকিয়ে তিনি আমাদের দিকে তাকালেন। অল্প আলোর ভিতর দেখলাম দুর্বোধ্য চামড়ার খাঁচায় যত্ন করে বসানো রয়েছে একটি বয়স্ক মুখ। আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার ছেলেটা এই জঙ্গলেই থাকত। বহু লোককে মেরে দিয়েছিল ও একাই। মাওবাদী ছিল। পরে পুলিশ গুলি করে ওকে মেরে দিল। এসব শোনা কথা। আমরা জানি ও মরে গেছে। ওর বডি আমাদের কাছে আসেনি। যাওয়ার আগে এই মোবাইল ফোন দিয়েছিল আমাকে। যে যে গান দিয়েছিল, সেগুলোই শুনি। আমার বাড়ি সামনেই। রাতে ও কয়েকবছর আগে দেখা করতে এলে এখান দিয়েই আসত চুপিচুপি। তাই রাতে খাওয়ার পর আমি এখানে এসে চুপ করে বসে ওর দেওয়া গান চালিয়ে দিই। যদি তাই শুনে কখনও বেরিয়ে আসে...আমি মরতে চাই। আমার ওই একটাই ছেলে। বউও মরেছে অনেকদিন। ছেলেটা বেঁচে আছে মনে হয় বলেই এখানে রোজ এসে বসে থাকি। ওকে একবার না দেখে মরতে পারছি না...

কলকাতা থেকে সামান্য কিছু দূরে মোটামুটি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বয়সী এক মানুষ মরবে বলে বসে আছে। কিন্তু, মরতে পারছে না। ওঁকে বলার ইচ্ছা ছিল, আমার বাবা শুনেছি খুব পাঁঠার মাংস এনেছে বাড়িতে। চলুন আমার সঙ্গে। ভালো করে বড় আলু দিয়ে পাঁঠার মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত খাই। চলুন...

যা বলতে যাই, যা বলতে চাই, তা তো কোনওদিনই বলা হয় না, তাই তার বদলে বলে ফেললাম সম্পূর্ণ অন্য কথা- পরের শনিবারও এখানে আসব। আপনি  এখানে থাকবেন তো?

ফুলেশ্বর পয়রা বললেন- আমার ছেলেটা অনেক লোক মেরে নিজে মরে গেছিল। আমি এখনও কাউকে মারিনি। এইখানেই বসে থাকব। মাঝেমাঝে মনে মরে যাই। কেশিয়াড়ি মিদনাপুর রুটের অনেক বাস চলে যায় এখান দিয়ে। রাস্তার মাঝে সকাল সকাল দাঁড়িয়ে পড়লেই হল।  তবে, আমি মরব না। আসবেন...

আমি যাকে বড় আলু দিয়ে পাঁঠার মাংস খাওয়াতে চেয়েছিলাম, সেই মানুষটি তারপর আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে বসলেন- আপনাকে টাটকা দেশি মাছ খাওয়াব...

ওই ঘটনার প্রায় দু'বছর বাদে অন্ধকার জানলার বাইরে আমার ঘরের সামনে গোঁজ হয়ে বসে আছে শহরতলীর ক্রমশ বিষণ্ণ হয়ে পড়তে থাকা অমাবস্যার রাত।এই দু'বছরে কত বন্ধু চলে গেল।  অনেক সম্পর্কও শেষ হয়ে গেল এমনি এমনিই। কতদিনের ঝুলকালিমাখা এই পৃথিবীর আরেকটি কার্তিক মাসের অমাবস্যার ভিতরে বসে থাকতে থাকতে তবু মনে হয়, আর কখনওই ওই অঞ্চলে না যাওয়া আমি ফুলেশ্বর পয়রাকে ডেকে এনে আলি আকবর খানের ‘রাগ ভৈরবী' শুনতে শুনতে আগামীকাল খুব সকালের বাজারটা থেকে একটু ঘুরে আসি। আমার বাবার কিনে দেওয়া মোবাইলটিতে ওই সুরটা বহুদিন ধরে রেখে দেওয়া আছে...