অটল যুগের অবসান

কলম থেমেছিল আগেই। এবার থমকে দাঁড়াল জীবন।  সব লড়াইকে মিথ্যা প্রমাণ করে অবসান হল অটল যুগের।

অটল যুগের অবসান

এ দেশের সংসদীয় রাজনীতি  নিয়ে যতদিন চর্চা হবে ততদিন উঠে আসবে  সুবক্তা অটলের কথা।

নিউ দিল্লি:

 

কলম থেমেছিল আগেই। এবার থমকে দাঁড়াল জীবন।  সব লড়াইকে মিথ্যা প্রমাণ করে অবসান হল অটল যুগের। 93 বছর বয়সে প্রয়াত হলেন অটল বিহরী বাজপেয়ী। ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্র হারালো তাঁর অন্যতম সেরা চরিত্রকে। 72 তম জন্মদিনে ভারত মায়ের কোল খালি করে, আসমুদ্র হিমাচল কাঁদিয়ে চিরতরে অতীত হলেন বাজপেয়ী।    

 

বাজপেয়ী এমন এক রাজনীতিবিদ ছিলেন যাঁর পরিধি  কোনও বিশেষ পদ দিয়ে ব্যাখ্যা করা  যায় না।  দেশ তাঁকে জানে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। প্রথম তেরো দিন, তারপর 13 মাস আর শেষমেশ পুরো মেয়াদ সরকার চালিয়েছিলেন অটল। বস্তুত তিনিই  ভারতের প্রথম অকংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী যিনি  নির্দিষ্ট সময়ের পুরোটাই পদে থাকতে পেরেছেন। এছাড়া বহু বারের সাংসদ এবং  বিভিন্ন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীও ছিলেন তিনি।  মোরার জি দেশাই সরকারের বিদেশমন্ত্রী হিসেবে জাতিসঙ্ঘে গিয়েছিলেন অটল।  সেখানে বিশ্বের বিভিঞ্জন দেশের প্রতিনিধিদের সামনে শুদ্ধ হিন্দিতে ভাষণ দিয়েছিলে তিনি। সেই ঘটনা আজও ইতিহাস হয়ে আছে।                          

 

এ দেশের সংসদীয় রাজনীতি  নিয়ে যতদিন চর্চা হবে ততদিন উঠে আসবে  সুবক্তা অটলের কথা। দশকের পর দশক ধরে সংসদকে সমৃদ্ধ করেছিলেন বাজপেয়ী।  মোট 47 বছর সংসদ সদস্য ছিলেন বাজপেয়ী।  আর এর মধ্যে বোধহয় এমন একটা দিন ও যায়নি যেখানে তিনি কী বলবেন তা শুনতে সাংসদরা আগ্রহ প্রকাশ করেননি। 

তাঁর যুক্তিবাণ থেকে রেহাই পাননি খোদ  প্রথম  প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুও। সেই 1957 সালে প্রথমবার সংসদে ভাষণ দেন অটল। তখনই তাঁর ভাষণ শুনে মগ্ধ হন নেহরু। আর তাই  বিদেশ থেকে আসা একটি  প্রতিনিধি দলের সঙ্গে অটলের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় জওহরলাল বলেছিলেন বাজপেয়ীই হবেন দেশের আগামী প্রধানমন্ত্রী। সে কথা সত্য হয়েছিল বেশ কয়েক দশক বাদে।                                                 

      

বাজপেয়ীর  সেরা ভাষণ কোনটা তা নিয়ে রাজনৈতিক ভাষ্যকরদের মধ্যে তর্ক আছে। কিন্তু মাত্র তেরো দিনের মধ্যে সরকার পড়ে যাওয়ার পর তিনি যা বলেছিলেন তা আজও দেশবাসীর মনে গেঁথে আছে। দীর্ঘ বক্তব্যে আক্রমণ করেছিলেন অন্য রাজনৈতিক দলগুলিকে। কিন্তু তার মধ্যে  ছিল না একটিও  অসংসদীয় শব্দ। ভাষণের একটি অংশে বাজপেয়ী বলেছিলেন, সরকার ক্ষমতায় আসবে, আবার চলেও যাবে। কিন্তু দেশ নিজের জায়গাতেই থেকে যাবে। এই বক্তব্য থেকেই চেনা যায় ব্যক্তি অটলকে। এই ঘটনার তিন বছর বাদে একটি আস্থা ভোটে পড়ে যায় তাঁর সরকার। সেবারও নিজের ভাষণে বিপক্ষের কোনও নেতাকেই ব্যক্তিগত আক্রমণ করার পথে  হাঁটেননি বাজপেয়ী।                          

দেশের প্রধান হিসেবেও তাঁকে ভুলে যাওয়ার কোনও অবকাশ নেই। সেটা  1998 সালে পোখরানে পারমানবিক বোমা বিস্ফোরণ হোক বা কার্গিল যুদ্ধ-  দেশের রাজনীতিতে মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া বহু সিদ্ধান্তই এসেছিল তাঁর কাছ থেকে।                 

আজ থেকে সাড়ে তিন দশক আগে অটল এবং আরও কয়েকজন মিলে তৈরি করেন বিজেপি। তিনিই ছিলেন প্রথম সভাপতি। কিন্তু তা বলে সব সময় যে দলের  সিদ্ধান্ত কে মান্যতা দিয়েছেন সেটা ভাবার অবকাশ নেই! যে রামমন্দির আন্দোলন বিজেপির অন্যতম হাতিয়ার সেই আন্দোলনে বড় ভূমিকায় ছিলেন না তিনি। আন্দোলন চলার সময় করসেবকদের উপর গুলি বর্ষণের তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন বাজপেয়ী।

রাজনৈতিক মহল মনে করে  এটাই ছিলেন বাজপেয়ী। সব সময় নিজের আদর্শকে পাথেয় করে পথ চলাই ছিল তাঁর  জীবনের উদ্দেশ। কিন্তু নেতা আর রইলেন না।  রয়ে গেল তাঁর আদর্শ –শিক্ষা। ক্রমশ দিশাহীন হতে থাকা সংসদীয়  রাজনীতি হয়ত বা দীর্ঘ দিন তাঁর অভাব অনুভব  করবে।